গেল মার্চের স্বস্তির বৃষ্টি অতিবৃষ্টিতে রূপ নিলে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে গোটা হাওরাঞ্চল। দেড় মাসের টানা বৃষ্টিতে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জের লক্ষাধিক কৃষক পরিবার। দুর্যোগ মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে হাওরাঞ্চলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুনামগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ কৃষকই সরকারি মানবিক সহায়তার চাল ও নগদ অর্থ পাননি। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি হয়নি কিংবা কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যক্তিদের নাম তালিকাভুক্ত করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
সুনামগঞ্জ কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলার ১২ উপজেলায় মানবিক সহায়তার জন্য ৬৪ হাজার ৩৮৪টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদরে ৪ হাজার ৬৩০, বিশ্বম্ভরপুরে ২ হাজার ৪৬৬, জামালগঞ্জে ৫ হাজার ১০৩, শান্তিগঞ্জে ২ হাজার ৭০৩, তাহিরপুরে ৯ হাজার ১৫৯, ছাতকে ১ হাজার ৯৪, দিরাইয়ে ১১ হাজার ৭৫৬, জগন্নাথপুরে ৩ হাজার ৬০৩, দোয়ারাবাজারে ১ হাজার ৪০, শাল্লায় ১০ হাজার ১২৫, ধর্মপাশায় ৫ হাজার ৪৩৪ এবং মধ্যনগরে ৭ হাজার ২৭১টি পরিবার রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের মধ্যে বড় একটি অংশের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এলাকায় বসবাস করেন না, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের পাশাপাশি নিকটাত্মীয়, ঘনিষ্ঠজন এবং পছন্দের লোকজনের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তালিকা প্রণয়নে সরকারদলীয় কিছু নেতাকর্মী এবং চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও উঠেছে।
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে মানবিক সহায়তার চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাওয়া ৮২ জনের মধ্যে অন্তত ৫০ জনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এমনকি জমিজমা নেই বা বোরো আবাদই করেননি—এমন ব্যক্তিদেরও সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই একই ধরনের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে।
গোপালপুর গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক কালীকৃষ্ণ দাস বলেন, ‘জমি করছিলাম ১৫ কিয়ার। আমার ৮ কিয়ারের ক্ষতি হইছে। এইডি এক্কেবারে তলাইয়া গেছে, কাটতে পারছি না। আমারে কিচ্ছু দিছে না, অথচ আমরার গ্রামের যারার ক্ষতি হইছে না, তারারে দিতাছে। আমরার ওয়ার্ডের মানিক মেম্বারে দেইখ্যা দেইখ্যা নাম দিছে। আমার নাম নাই।’
গত ২১ জুন জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের বাউধরন গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা অভিযোগ দেন। ১০ জনের স্বাক্ষরিত অভিযোগে গ্রামের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নন—এমন ১২ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ তুলে তদন্ত করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাভুক্ত করার আবেদন জানানো হয়।
ওই গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. তুরুক মিয়া বলেন, ‘যে সাহায্য আইছে, এইডা মনে করৌক্কা যেরা পাইতো এরা পাইছে না। যেরার খেত নাই, এরা পাইছে। এক বাড়িতে তিন-চাইট্টা নাম। কোনো জমিজমা করছে না। এরার হাবিগোষ্ঠী লন্ডন। কিন্তু ক্ষতি হইলেও আমরার নাম নাই।’
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গেল বোরো মৌসুমে জেলার ছোট-বড় ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। জেলায় কৃষি কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ হলেও প্রায় ৪ লাখ কৃষক চাষাবাদ করেছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন কৃষকের ৪৩ হাজার ৭৪৭ হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৯২ কোটি ৮৪ লাখ ৬৪ হাজার ২০১ টাকা। চালের হিসাবে ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৩৯৭ টন।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ সুনামগঞ্জের আহ্বায়ক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ-মানববন্ধন হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এসব সহায়তায় প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হয় না। এগুলো কৃষকের নাম ভাঙিয়ে ফাঁকিবাজি ছাড়া কিছুই না। এসব বাদ দিয়ে কৃষকদের ফসল বীমার আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি, ইউএনওর প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি ও কৃষি বিভাগ মিলে মানবিক সহায়তার তালিকা করা হয়েছে। এককভাবে কেউ তালিকা করেনি। ভুলত্রুটি হলে উপজেলা কমিটি খতিয়ে দেখবে।’
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, মে, জুন ও জুলাই—এই তিন মাসের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল সহায়তা দেওয়ার চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা উপজেলা থেকে হয়েছে। এক্ষেত্রে যেসব জায়গায় অনিয়মের অভিযোগ আছে, উপজেলা প্রশাসনকে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’